বিয়ের পূর্বে মেয়েটির পরিবার জানত না তাদের মেয়ের জামাই ভালো মানুষের আড়ালে একজন মাদকসেবী। মেয়ের সুখের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী মেয়েকে বিয়ে দেন শহরতলীর মেজরটিলা এলাকার জাহানপুরের আব্দুর রহমান সাগরের কাছে। এর পর থেকেই শুরু হয় যৌতুকের জন্য মেয়ের উপর অমানুষিক নির্যাতন। নির্যাতনের মাত্রা দিনে দিনে জটিল আকার ধারণ করে। প্রায় সময়ই সকালে ও রাতে দু’দফা একটি কক্ষের মধ্যে আটক নির্যাতন করতেন নির্যাতিতা রুজিনার স্বামীসহ তার পরিবারের ৫ জন। যেদিন তার উপর নির্যাতর করা হত সেদিন তাকে কোন খাবারও দেয়া হত না। এমনকি নির্যাতন করে ওই গৃহবধূর ৭ মাসের শিশুও গর্ভে থাকাকালীন সময়ে মারা যায়। এর পরেও থেমে থাকেনি স্বামী, শাশুড়ী, ননদ ও ভাসুরের নির্যাতন। এভাবেই মেয়ের উপর অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন গৃহবধূ রুজিনা আক্তারে (৩০) পিতা আমজাদ আলী।
গৃহবধূ রুজিনা আক্তার সিলেট নগরীর তেররতন এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি সিলেট ওসমানী হাসপাতালের ২য় তলার ১৭নং ওয়ার্ডের পি-১ বেডে ভর্তি আছেন। ছাদ থেকে ছোড়ে ফেলায় তার দু-হাত, বাম পা ও কোমরের হাড় ভেঙে গেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়- ২০১২ সালে নগরীর শাহপরান থানাধীন তেররতন এলাকার বাসিন্দা আমজাদ আলী সামর্থ্য অনুযায়ী বিয়ে দেন শহরতলীর মেজরটিলা এলাকার জাহানপুরের আব্দুর রহমান সাগরের সাথে। এরপর থেকে স্বামী, শাশুড়ী, ননদ ও ভাসুর মিলে শুরু করেন তার উপর যৌতুকের ৫ লাখ টাকা দেয়ার জন্য অমানুষিক নির্যাতন। নির্যাতনের মাত্রা দিনে দিনে শুধু বাড়তেই তাকে। মেয়ের ভবিষৎ আর সংসারের কথা চিন্তা করেই নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারের মেয়ের পরিবার কয়েক দফায় দু’লাখ টাকাও দেন সাগরকে। সাগর এই টাকা দিয়ে ব্যবসা না করে মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় আবার নির্যাতন। এমনকি নির্যাতনের সময় রুজিনা আক্তারের স্বামী দ্বিতীয় বিয়ের জন্য তার কাছ থেকে স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষরও নিতে চেয়েছিলো। কিন্তু রুজিনা শত নির্যাতন সহ্য করেও দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেননি। এমনকি রুজিনাকে প্রায় দেড় বছর থেকে তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে দেয়া হয়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও স্বামী মাদকের টাকা যোগানের জন্য বিক্রি করে দিয়েছিলো। শুধু তাই নয় মাঝে মধ্যে খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য রুজিনা আক্তারের ভাই, বোন পিতা তার স্বামীর বাড়িত গেলেও রুজিনাকে হুমকি দেয়া হত তাদের কাছে নির্যাতনের ঘটনা বললে তাকে তালাক দিয়ে দেবে। তাই ভয়ে তিনি তার পিত্রালয়ের কারো কাছে মুখ খুলেননি। তবে একসময় তা প্রকাশ পায়। এরপর তাকে পিত্রালয়ে নিয়ে আসা হলে পুনরায় তাকে স্বামীর বাড়ির লোকজন নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষমা চেয়ে তাকে নিয়ে যান। এরপরেও মেয়ের সুখের জন্য কয়েক দফায় সাগরকে ২ লাখ টাকা দেয়া হয়। কয়েকদিন পর আবারো শুরু হয় তার উপর আবার অমানুষিক নির্যাতন। বর্তমানে রুজিনা আক্তারের দেড় বছরের হাফিজা নামের একটি মেয়ে রয়েছে।
অর্থোপেডিক্স বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক জানান- উপর থেকে ফেলে দেয়ার কারণে তার দু-হাত, কোমরের হাড় ও বাম পা ভেঙে গেছে। এছাড়াও রুজিনা আক্তার আমাদেরকে জানান- তার সিজার অপারেশনের স্থানে বর্তমান রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
সূত্রে আরো জানা যায়- এ ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য ৪নং খাদিমপাড়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার মনজু মিয়া ও মহিলা মেম্বারনি দৌড়ঝাঁপ করছেন। এমনকি তারা নির্যাতিতা রুজিনা আক্তারের পরিবারকে মামলা না দিতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। এ ঘটনাটি তারা বসে দেখে দিবেন বলেও প্রলোভন দেখিয়ে যাচ্ছেন।
সিলেট ওসমানী হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগে চিকিৎসাধীন নির্যাতিতা রুজিনা আক্তার জানান- যৌতুকের ৫ লাখ টাকা ও দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি না দেয়ায় বুধবার সকালে আমার স্বামী সাগর, শাশুড়ী রুকেয়া বেগম, ননহড়ি ইয়াছমিন বেগম, ননদ জুসমিয়া ও ভাসুর বুলবুল মিলে আমাকে রোমে আটকে রেখে নির্যাতন করেন। পরে ওই দিন বিকেলে সাগর আমাকে চাকু হাতে নিয়ে তাড়া করে। আমি ভয়ে বাসার ছাদের উপর উঠে যাই। সেখানে গিয়ে ভাসুর, ননদ, শাশুড়ী মিলে আরেক দফা নির্যাতন করেন। এরপর স্বামীসহ তারা মিলে আমাকে ২য় তলার ছাদ থেকে নিচে ছোড়ে ফেলে দেয়। প্রায় দিনই নির্যাতনের সময় আমি আমার স্বামীকে বলতাম ‘আমার পরিবার গরীব আমি কই তাকি টাকা দিতাম’। তবুও সে নির্যাতন করতো আমার উপর।
রুজিনা আরো জানায়- সাগর একটি মার্ডার মামলার আসামি প্রায় সময়সে সুনমগঞ্জের আদালতে হাজিরা দিতে যায়। তাদের নির্যাতনের কারণে পূর্বে আমার গর্ভে থাকা ৭ মাসের শিশুও মারা যায়। এমনকি আরো একটি শিশুর জন্ম হলেও সে দুর্বল থাকার কারণে তিন দিনের মাথায় মারা যায়।
নির্যাতিতা মেয়ের ভাই শামীম আহমদ বলেন- ৫ লাখ টাকা যৌতুক না দেয়ায় তার স্বামী সাগর প্রতিটি দিনই নির্যাতন করতো। এমনকি সাগরের সাথে নির্যাতনে যোগ দিতেন তার মা, বোন, ভাই। বোনের সুখের জন্য তার দাবি অনুযায়ী আমরা তাকে কয়েক দফায় ২ লাখ টাকা দেই। এই টাকাও আমরা অনেক কষ্টে দিয়েছি। পরবর্তীতে সাগর আমাদেও কাছে আরো ৫ লাখ টাকা দাবি করে ব্যবসার জন্য। সেটাকা না দেয়ায় নির্যাতন করতো সে। এমনকি আমার বোনকে এসব না বলার জন্য হুমকিও দিত।
রুজিনা আক্তারের বড় বোন শরীফা খানম জানান- সাগর একজন মাদকসেবী। যৌতুকের টাকা না দেয়ায় সে ও তার পরিবারের সদস্যরা মিলে আমার বোনকে নির্যাতন করতে প্রতিটি দিন। এমনকি নির্যাতন করে তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হতো। কোন ধরনের খাবারও দেয়া হত না। যৌতুকের টাকা না পেয়ে তারা আমার বোনকে বুধবার বাসার ২য় তলা থেকে ছুঁড়ে ফেলে হত্যার চেষ্টা করে।
এ ব্যাপারে ৪নং খাদিমপাড়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার মনজু মিয়া জানান- নির্যাতনে নয় রুজিনা আত্মহত্যার জন্য ছাদ থেকে লাফ দেয়। রুজিনার স্বামী আব্দুর রহমান সাগরের ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারের বেশ কয়েকবার যোগাযোগা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন জানান- এ ঘটনায় কেউ থানায় অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলেই আমরা সাথে সাথে আইনি ব্যবস্থা নেব।
এদিকে, গৃহবধূকে ছাদ থেকে ছুঁড়ে ফেলার ঘটনায় শাহপরান থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। নির্যাতিতা গৃহবধূ রুজিনা আক্তারের ভাই ছামির আহমদ মাসুম বাদি হয়ে ৭ জনকে আসামি করে দুপুরে মামলা (নং-১) দায়ের করেন।
পুলিশ জানায়- যৌতুকের জন্য মঙ্গলবার বিকেলে ওই গৃহবধূকে স্বামী, শাশুড়ী, ননদসহ ৬-৮ মিলে নির্যাতনের এক পর্যায়ে বাসার ২য় তলার ছাদ থেকে ছুঁড়ে ফেলা হত্যার চেষ্টা করেন। এমনকি নির্যাতনের এক পর্যায়ে ওই গৃহবধূ আত্মরক্ষার্থে বাসার ছাদে উঠলে তাকে সেখানে আরেক দফা নির্যাতন করে ছাদ থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলা হয়।
মামলার এজহার নামীয় আসামিরা হচ্ছে- আব্দুর রহমান সাগর, লোকমান মিয়া, বুলবুল আহমদ, জুসমিনা, জেসমিন, রোকেয়া বেগম, দিলমান আসামিরা মেজরটিলা এলাকার সৈয়দপুরের জজ সাহেব রোডের বাসিন্দা। তাদের গ্রামের বাড়ি জগন্নাথপুর থানার আগুনকোণা গ্রামের বাসিন্দা।
শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন মামলা দায়েরের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন- নির্মমভাবে নির্যাতন করে গৃহবধূকে বাসার ছাদ থেকে ছুঁড়ে ফেলর ঘটনায় গৃহবধূর ভাই বাদি হয়ে ৭ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ মামলার এজহার নামীয় আসামিদেরকে গ্রেফতারের জন্য ইতিমধ্যে অভিযান চালিয়েছে। পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

0 facebook:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন